পুং লালসার জন্মভিটে | সত্যেন্দ্রনাথ পাইন
পুং লালসার জন্মভিটে
সত্যেন্দ্রনাথ পাইন
"ফিমেল জেনিটাল মিউটিলেশন" (এজিএম)
বিষয়টা খুব একটা চর্চিত নয় আমাদের ভারতীয় সভ্যতায়। তাই এটা নিয়ে কেউ চিন্তিতও
নন। অথচ এটি নাকি প্রধানত আফ্রিকার দেশগুলোতে এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও
মধ্যপ্রাচ্যে এই প্রথা যুগ যুগ ধরে বাহিত হচ্ছে। প্রথাটি হোল - বয়ঃসন্ধির
মেয়েদের অস্ফুট বা অল্পবিকশিত স্তনে গরম পাথর দিয়ে মালিশ করা যাতে মেয়েদের স্তন
ভালোভাবে উচ্চকিত হতে না পারে।
ধারনা, এর ফলে পুরুষদের লালসা থেকে বাঁচানো সম্ভব, যৌন কামনা থেকে
নিবৃত্ত রাখতে চেষ্টা করা। ও’দেশে মেয়েদের
যৌনাঙ্গেরও অনেকটা অংশই কেটে ফেলা হয় শুধুমাত্র প্রস্রাবের জন্য ও রজঃস্রাবের জন্য
ছোট্ট একটা ছিদ্র রাখা ছাড়া। - এর কারণ কী, অবশ্য তার ব্যাখ্যা মেলে না। এটি নাকি একটা সামাজিক
প্রথা ও’দেশে। যা কিনা
মেয়েটির মা-দিদিমা-মাসীমারা করে থাকে সামাজিক অপরাধের থেকে বাঁচতে। হায়রে নারী!
হায়রে সভ্যতা!
পুরুষ মানেই কি অত্যাচারিত খড়্গ কৃপাণ আর
নারীরা সদাই বলিপ্রদত্ত!(?)
শূণ্য এ বুকে সংস্কার ও
সংস্কৃতির এরকম হস্তক্ষেপ কি অপরাধ নয়? এর জন্য কি কোনো মহাপুরুষ বা অবতারের প্রয়োজন আছে?
আমরা প্রত্যেকেই যখন
শিশু ছিলাম, মাতৃজঠরের ক্ষুদ্র পরিসর
থেকে ছুটি নিয়ে প্রকৃতির
কোলে ভূমিষ্ঠ হলাম তখনিই প্রয়োজন হোল মাতৃক্রোড় এবং শারীরিক ভাবে বৃদ্ধি পেতে
মাতৃদুগ্ধ। এই মাতৃদুগ্ধ মানেই তো মায়ের স্তনদুগ্ধ, আর সেই স্তন যুগল ভিন্ন
সংজ্ঞায় ছায়া থেকে বাঁচতে ধামাচাপা দেবার রীতি বুদ্ধি-বিবেকহীন মাতৃত্বের
অবমাননা ছাড়া আর কী বলা যেতে পারে? নূন্যতম নাগরিক কর্তব্য ও ধর্ষিত হয় এর ফলে।
পুং লালসার শিকারী হতে না দিয়ে
যে রীতি এখনও আফ্রিদি সমাজে নন্দিত তা মোটেই মেনে নেওয়া যায়না। এটা প্রেম নয়!
এটা অত্যাচার ও নারীদ্বেষ বলা যেতে পারে।
"ব্রেস্ট আয়রনিং" বা "স্তন
ইস্তিরি" মোটেই নারী লালসা থেকে বা পুরুষদের যৌনক্ষুধা থেকে বাঁচতে মোক্ষম
অস্ত্র হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না।
এর ফলে তথ্য বলছে, নারীর স্তন দেশে ক্ষত, সংক্রমণ, স্তন্যপান করানোর সমস্যা থেকে ক্যান্সার পর্যন্ত হতে
পারে। তাই এটির যথার্থ ব্যাখ্যা সহ উক্ত দেশগুলোতে বিধান দেওয়া আশু কর্তব্য। সমাজ
থেকে এই নিদারুণ অসুখ দূর করে মানবসভ্যতার মূলস্রোতে ওদের ফিরিয়ে আনতে
রাষ্ট্রসংঘেরিই উদ্যোগ নেওয়া উচিৎ।
আইন নয়। চাই সেই দেশের
সংস্কৃতির আমূল
পরিবর্তন। আমাদের দেশে "সতীদাহ প্রথা" উচ্ছেদে রাজা রাম মোহন রায়
যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন সেরকম কোনো বিপুল জনসমর্থন প্রয়োজন সেই দেশের মেয়েদের উপর
শারীরিক নির্দয় ও নিরুপায় তা থেকে রক্ষা করার।
কী সমাজ?
পুরুষ যৌনতার লালসা যদি এতই
তীব্র হয় তাহ'লে
শুধু বালিকাকে বা নারীকেই তার খেসারত দিতে হবে কেন?
আশ্চর্য সমাজ আরোও আশ্চর্য
বর্তমান মানব-সভ্যতা!!
নারী কষ্ট ভোগ করুক, মরুক, পুরুষদের লালসা মুক্ত হতে হবে, এটাই বিধান। না। না।
এটা মানবিক নৃশংসতা এবং পাশবিক অত্যাচার. যা কিনা মেয়েদের (মা
দিদিমা মাসীমার) হাতেই মেয়েদের উপর ঘৃণ্য অত্যাচার।
নারীর স্তনযুগল পুরুষদের লালসার
লক্ষবস্তু হলে -
পুরুষদের নারীপ্রেম(!)কে আইনি ব্যবস্থার আওতায় আনা হোক। নাহ'লে শিশু
অত্যাচার বা চাইল্ড আ্যবিউসের ধারায় উক্ত সমাজের শাস্তি নির্ধারিত হোক্।
পুরুষ লালসার জন্মভিটে কে উচ্ছেদ
করাটা সমাধানের পথ হতে পারে না। কোনো মতেই এটা মানা সম্ভবোও নয়।
মাতৃস্তন, মাতৃদুগ্ধ
বিতরণ করে। সেখানে স্তনযুগলের বহিঃপ্রকাশকে এমন নিন্দনীয় ভাবে রুদ্ধ করার কোনো
যুক্তি গ্রাহ্যতা খুঁজে পাওয়া খুবই কঠিন।
পৃথিবীতে যত রকমের নিন্দনীয়
অত্যাচার চলছে তার মধ্যে এও একপ্রকার জঘন্য জঙ্গিপনা বলা যেতেই পারে।
এই জঙ্গিপনা থেকে মুক্তি পেতে
আশু ব্যবস্থা নিরুপিত হোক।
রাষ্ট্রসংঘে আলোচিত হোক এবং
সমাধান নির্ণিত হোক।
পুরুষতন্ত্র নিন্দিত হোক - নারী
সুস্থ সবল হোক।
বিকৃতমনস্ক-মগজ অপরাধ বোধে
জাগ্রত হয়ে নারীকে তার আপন সভ্যতায় বিকশিত হতে, সাহায্য করতে এগিয়ে আসুক মানবসভ্যতার
উন্নয়নে।
দ্বিধা নয়, দ্বন্দ্ব নয়, ধন্দ নয়,
স্পর্শ কাতরতায় চুপ করে ঘুমিয়ে থাকা নয়, সমাধানের উপায়
নির্ধারিত হোক।
এখনিই, এই মুহূর্তেই।
সূত্রঃ (দৈনিক
প্রতিদিন ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯)
মন্দাক্রান্তা
সেনকে আমার অশেষ কৃতজ্ঞতা।
(মতামত লেখকের নিজস্ব। এরজন্য কেউ দায়ি নন।)







No comments
Post a Comment